রাফিয়া চৌধুরী :বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মেগা প্রকল্প ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশ(DNP- DRC)-কে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম এক অভিনব ও প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির নেটওয়ার্ক।২০১২ সালে এই প্রকল্পের টেকনিক্যাল পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মূলত আইটি কোম্পানি 'টাইগার আইটি'। একশ্রেণীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের যোগসাজশে বিআরটিএ-কে জিম্মি করে ফেলা হয়ব ২০২৫ সালে এই কোম্পানির ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের ডায়েরি প্রকাশ পাওয়ায় এবং কিছু কর্মকর্তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাঞ্জ পুরো প্রকল্প সচল রাখতে সাজানো হয় এক চাতুর্যপূর্ণ আইনি নাটক। কোনো প্রকার ওপেন টেন্ডার বা দরপেএ আহ্বান ছাড়াই। 'আইসিএল' (ICL) নামক একটি সংস্থাকে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অনুসন্ধান বলছে আইসিএল মূলত টাইগার আইটিরই একটি ছদ্মবেশী রূপ। কোম্পানির নাম বদলালেও বদলায়নি ভেতরের চালিকাশক্তি।টাইগার আইটি ব্যবহৃত পুরনো 'EVR' সফটওয়্যার এবং তাদের তৈরি করা দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে বহাল রেখেই চলছে শতকোটি টাকার সমান্তরাল অবৈধ বাণিজ্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্লোগানকে পুঁজি কর শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তার স্ত্রী শাহনাজ সিদ্দিকির সরাসরি মদেদে এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে বিতর্কিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'টাইগার আইটি'। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থলের থাকা বেড়াল একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
এই পুরো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মূল কান্ডারি হলেন প্রকল্পের মিরপুরের ম্যানেজার আল-আমিন। ২০১২ আইটিতে এনরোলমেন্ট এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করেন, তখন তার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১০ হাজ সার্কেলের বর্তমান ইনচার্জ ফরহাদের সাথে মিরপুরের একটি মেসে সিট শেয়ার করে থাকতেন তিনি।
তবে টাইগার আইটি প্রধান কার্যালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার অলৌকিক ক্ষমতার জোরে প্রজেক্টের একাধিক সহকারী ম্যানেজারকে ডিঙিয়ে ২০২৪ সালে কোটি টাকার গোপন লেনদেনে তিনি প্রকেক্টের ম্যানেজার পদটি বাঞ্জিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে তার বৈধ বেতন ৪০ হাজার টাকা হলেও তার জীবনযাত্রা এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় রুপকথাকেও হার মানায়।মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সাড়ে ৬ লক্ষ টাকার 'Honda x Motion মেট্রো ল-৫১-৫৫৫৫) মোটরবাইক, ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার Samsung S25 Ultra এবং ১ লক্ষ ৭12 ফোন তার বিলাসী জীবনের সামান্য অংশ মাত্র। নিজ জেলা বগুড়ায় প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের মশারির ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছেন তিনি।
২০২৫ সালে কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমে তার এই সাম্রাজ্যের খবর ফাঁস হলে তিনি সাময়িকভাবে জার্মানিতে আত্মগোপন করেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে সেটেল হওয়ার সব কাগজ ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছেন বলে জানা গেছে। কোনো তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের কথা বললে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক উপ-পরিচালক তার 'মামা' বলে প্রকাশ্যে দুনীতি করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আল-আমিন এবং তার এই গ্যাং যাতে কোনো প্রকার বদলি বা আইনি ঝামেলার মুখোমুখি না হয়, সেজন্য টাইগার আইটি প্রধান কার্যালয় এবং বিআরটিএ-র উচ্চপর্যায়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৬ লক্ষ টাকা বখরা বা মাসোহারা দেওয়া হয়।
টাইগার আইটি প্রধান কার্যালয়ের কোটা (মাসিক ৯ লক্ষ টাকা): এই অবৈধ অর্থের নিয়মিত সুবিধাভোগীরা হলেন সিইউ আহসানুল হাবীব, টেকনিক্যাল টিমের প্রধান রুহুল রনি, টেকনিক্যাল সাপোর্ট টিমের বেলাল হোসেন, প্রজেক্ট হিসাবরক্ষক আক্কাস আলী (যার বাসা মিরপুর-১৩ বিআরটিএ-র বিপরীতে হওয়ায় সে নিজে সরাসরি দালালের সাথে বসে অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেন), প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মাসুদ সুজনের সহযোগী রক্সি, এইচআর হুমায়রা এবং নম্বর প্লেটের সাবেক পিডি মহিউদ্দিন।
বিআরটিএ সদর দফতর কোটা (মাসিক ১২ লক্ষ টাকা): প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সীতাংশু শেখর ও এ ডি শেখ ইমরানের মাধ্যমে এই মোটা অঙ্কের অর্থ মাসোহারা দেওয়া হয়।
বিবিধ কোটা (মাসিক ৫ লক্ষ টাকা): প্রশাসন ও অন্যান্য সেক্টর ম্যানেজ করতে এই অর্থ ব্যয় করা হয়।
এই সিন্ডিকেটের ক্ষমতার দাপট এতটাই তীব্র যে, মিরপুর সার্কেলের সাবেক সৎ ম্যানেজার সাখাওয়াত হোসেন যখন তাদের এই দুর্নীতিতে বাধা দিতে যান, তখন টাইগার আইটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগের চিঠি ইস্যু করা হয়। তাকে ম্যানেজার পদ থেকে নামিয়ে 'এনরোলমেন্ট এক্সিকিউটিভ' করে গাজীপুরে বদলি করা হয় এবং তার কিছুদিন পরেই তাকে চাকরিচ্যুত করে আল-আমিনকে ম্যানেজারের চেয়ারে বসানো হয়।
অনুসন্ধান আরও বলছে, গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান অথবা আত্মগোপনে চলে যান। তাদের ফেলে যাওয়া কোটি কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়িগুলো (যেমন: ল্যান্ড ক্রুজার, প্রাডো, হ্যারিয়ার, অডি) দ্রুত নগদ টাকায় রূপান্তর করার প্রয়োজন পড়ে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, মোটরযানের মালিকানা পরিবর্তন করতে হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে বিআরটিএ কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে লাইভ বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) ও ছবি দিতে হয়। কিন্তু বিক্রেতা পলাতক থাকায় টাইগার আইটির EVR সফটঅয়্যারের ব্যাকঅ্যোন্ড জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।মিরপুর বিআরটিএ-র প্রভাবশালী দালাল হারুন অর রশিদ রুবেল ম্যানেজার আল-আমিনের নেতৃত্বে গাড়িপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে বিক্রেতার অনুপস্থিতিতেই ফাইল পাস হচ্ছে। টাইগার আইটির সফটওয়্যারে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে 'ব্যাকডেট এন্ট্রি', জাল দস্তখত এবং ভুয়া হলফনামা যুক্ত করে নি মালিকানা পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে। আর এই পুরো চক্রের মূল 'কন্ট্রোল রুম' হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মিরপুর বিআরটিএ--পাশের শাহরাস্তি বিজনেস সেন্টার। আপাত দৃষ্ঠিতি এটি সাধারণ একটি ব্যবসার দোকান মনে হলেও মলূত এটি পলাতক লীগ নেতাদের কোটি টাকার গাড়ি কেনা বেঁচার আখড়া এবং বিআরটিএর ফাইল জালিয়াতির মূল আঁখড়া। বর্তামানে এই কাজের আলামিনের প্রধান লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করছেন মোঃ মোজাম্মেল।তিনি বিআরটিএর একটা খাবারের দোকান পরিচালনা করেন এবং অবৈধ্য ক্লাম ব্যবাসা সহ নানান ধরণেল সিন্ডিকেট ম্যানে
২০২৩ সালে সাংবাদিকের হাতে এবং ২০২৫ সালে নির্বাহী ম্যা দুর্নীতির দায়ে ১ মাসের সাজাপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত হন। পরবর্তীতে আল-আমিনের সুপারিশে রাতের ডিউটি নি শুরু করেন (প্রতি লাইসেন্সে ১৫-২০ হাজার টাকা)। মাত্র ৮-১০ হাজার টাকা বেতনের এই গার্ড তার গ্রামে বা আলিশান বাড়ি, মাছের ঘের, গরুর ফার্ম এবং গাজীপুরে শ্বশুরবাড়িতেও বাড়ি করেছেন। তিনি প্রতি বছর কোরবানিও দেন এবং আল-আমিনের অন্যতম ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করেন।
৫. ফারুক আহমেদ (সিকিউরিটি গার্ড, G4S): স্টোর রুমের দায়িত্বে থাকা ফারুক আল-আমিনের আরেক রুমে ডিএনপি ও ডিআরসি থাকে, নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীরা বের হওয়ার সময় চেক করার কথা থাকলেও তিনি তিনিও এই কর্মচারীদের মাধ্যমে অবৈধ বাণিজ্য করেন। মাত্র ১০-১২ হাজার টাকা বেতন পেয়েও মিরপুর-১৩ থাকেন। তার ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফুটেজও রয়েছে।
৬. মোঃ ফরহাদ হোসেন (উত্তরা সার্কেল ইনচার্জ): আল-আমিনের সাবেক মেসমেট। বর্তমানে মিরপুর-১৩ এর উওর পাশে ফ্ল্যাট ও সাভার / আমিনবাজারে জমির মালিক।
৭. মেহেদী হাসান (পূর্বাচল সার্কেল ইনচার্জ): তার আপন বড় ভাই বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গাড়ির ড্রাইভার সীতাংশু শেখরের গাড়ির ড্রাইভার। বড় ভাইয়ের ক্ষমতার জোরে ও টাকা দিয়ে সব ধামাচাপা দেন। কেরানীগঞ্জের আটিবাজারে তার আলীশান বাড়ি রেয়েছে। ।
৮. বিপ্লব কুমার সাহা (কেরানীগঞ্জ প্রকল্প ম্যানেজার): বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সীতাংশু শেখরের আপন ভায়রা। ফরহাদ ও বিপ্লব নিজ নিজ সার্কেলে প্রায় ৯ বছর ধরে কর্মরত।
৯. ইব্রাহীম (ফিক্সিং অপারেটর): মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা বেতনের ফিক্সিং অপারেটর হয়েও মিরপুর-১৪ ভাষাণটেক এলাকায় ফ্ল্যাটের মালিক। তার সন্তানরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নামী স্কুলে পড়াশোনা করে। তার বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউ লেনদেনের তথ্য রয়েছে।
টাইগার আইটির টেকনিক্যাল একচ্ছত্র ক্ষমতার কারণে সিস্টেমে যেকোনো ভুয়া তথ্য ইনপুট দেওয়া সম্ভব তারিখ মোঃ তাজুল ইসলাম নামের এক কর্মচারীকে জোরপূর্বক 'ঢাকা মেট্রো চ-১৯-৭০২৭' নাম্বারের একটি নম্বর পরীক্ষা না করেই ছবি তুলতে বাধ্য করেন আল-আমিন। পরবর্তীতে তাজুল গোপনে পরীক্ষা করে দেে করে ভুয়া চেসিস বসানো ছিল। এর আগেও মাকসুদুর রহমান 'ঢাকা মেট্রো ন-১১-৪৪৫০' নাম্বারের আরে পাস করানোর চেষ্টা করলে পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদ আনোয়ার সেটি জব্দ করে বিআরটিএতে রেখে
এছাড়াও ২৪/০১/২০২৩ সালে রাজশাহী থেকে 'ঢাকা মেট্রো ল-৫৬-১০৪৬' নাম্বারের একটি নম্বর প্লেট উচ্চ ফালিয়া ও প্লাবন রোজারিও কোনো বৈধ নথিপত্র ছাড়াই মিরপুর থেকে দালালের মাধ্যমে পাচার করেছিলেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত আল-আমিন নিজে ব্যাগে করে নম্বর প্লেট বাইরে এনে দালালের কাছে বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে।
বিগত দিনে দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ার পর আল-আমিন, মেহেদী ও ইব্রাহিমকে পূর্বাচলে এবং রুবেল করা হয়। কিন্তু মাত্র ৫-৬ মাসের মধ্যে রুবেলকে পূর্বাচলে ফিরিয়ে আনেন আল-আমিন। মিরপুরে কাজ কর ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকায় মাস্টারমাইন্ড আল-আমিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে নম্বর প্লেট সংযোজন কার্যক্র পূর্বাচল সার্কেলে স্থানান্তর করান।
এর ফলে গ্রাহক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ঢাকার বাইরের (যেমন ফরিদপুর) একজন গ্রাহক আ সাথে ডিজিটাল নম্বর প্লেট (DNP) ও স্মার্ট কার্ড (DRC) নিতে পারতেন। এখন তাকে নম্বর প্লেটের জন্য স্মার্ট কার্ডের জন্য আসতে হয় মিরপুরে। পূর্বাচলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে অফিস টাইমের শেষে গ্রাহক হতে বাধ্য করা হয়। এই স্থানান্তরের কারণে চক্রটির আয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে নম্বর প্লেট স্থানাত্ত গাড়িতে ৫,০০০ টাকা, মিডিয়াম গাড়িতে ৪,০০০ টাকা, মোটরবাইকে ৩,০০০ টাকা এবং ডিআরসি কার্ডে ২ নেওয়া হচ্ছে।
টাইগার আইটি ও আইসিএল-এর সফটওয়্যার প্রযুক্তির ব্যাকডোর ব্যবহার করে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রধান অভিযুক্ত আল-আমিন এবং সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হারুন অর রশিদ রুবেলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগযোগের চেষ।ঠা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।







